
সুন্দরবনের ইতিকথা
মাত্র কয়েক মাস আগে দুই ভাই আর এক সন্তানকে নিয়ে তারা তিনজন মাছ আর কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিল। সুন্দরবন উপকূলবর্তী এলাকা বাসিন্দা তারা। এটাই তাদের জীবন জীবিকা।
হঠাৎ ঝড় উঠে সমুদ্রের জল ফুলে ফেঁপে উঠে । বাতাসের দাপটে সমুদ্রের জলের উত্তাল অবস্থা,ও আকাশের পরিস্থিতি দেখে তারা সিদ্ধান্ত নিল কোন একটা খালের মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নেবে। প্রচন্ড ঢেউয়ের প্রাচীর পার করে তারা কোনো রকমে সমুদ্রের ধারে গিয়ে পৌঁছালো এবং একটা ঝরাতে আশ্রয় নিল। যার পাশে ছিল জঙ্গল, আর হেতালের ঝোপ।
ঝড় চলছে প্রায় আধঘন্টা মত হয়ে গেল। এমতবস্থায় বড় ভাই বুঝতে পারল কি জানি কোন একটা বিপদের সংকেত আসতে চলেছে।।
বহু বছর ধরে তিনি জঙ্গলে আসছেন তাছাড়া তিনি বয়সে বড় । তাই বাধ্য হয়ে তারা তারই কথা শুনে সেখান থেকে আবার বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
নৌকা তে থাকা মেশিন র্স্টার্ট দেওয়ার পরেও বোটটি আর এগোচ্ছে না।
তাই ছোট ভাইয়ের একমাত্র সন্তান ,তার ভাইপোকে বলল নিচে নেমে নৌকাটি একটু ঠেলে দিতে।
সে নির্দ্বিধায় টারজানের মতো জলে ঝাঁপ দিয়ে নৌকোটির ঠেলতে লাগলো। প্রথমে একটু নড়ে একই জায়গায় থমকে গেল, কিছুক্ষণ পরে চলতে শুরু করলো ছেলেটির হাতের ধাক্কায়, মেশিনটা কিন্তু বন্ধই রয়েছে। জঙ্গলের ভিতরটা যেন নিশ্চুপ হয়ে রয়েছে আর বাইরে ঢেউ আর বাতাসের গর্জন,, নৌকোটি ধীর গতিতে চলতে চলতে হঠাৎ করে যেন থমকে গেল বড় একটা দোলা খেয়ে,,, বড় ভাই দেখল পিছনে বিষয়টা দেখতে গিয়ে দেখল ভাইপো নেই,ছোট ভাইটা অর্থাৎ ওই ছেলেটির বাবা ছৈ-এর মধ্যে বসেছিল,, সেখান থেকে আওয়াজ দিয়ে বললো দাদা কি হয়েছে,, তিনি উত্তর দিলেন বাবুকে দেখা যাচ্ছে না,, বলল কি বলো দাদা? কোথায় গেল,, দূর থেকে বাবু চাপা স্বরে উত্তর দিল আমি এখানে!! নৌকা ছাড়া কিছুটা দূরে বাবু দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ,দুজনে চিৎকার করে বলল ওখানে দাঁড়িয়ে কেন চলে আয় এই জায়গাটা ভালো না বিপদ আসতে পারে, কারণ তারা জানছ যেখানে বাঘের বসবাস তার আশেপাশে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে।
তবুও বাবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কে বা জানতো বাবুর পা টা কুমিরের মুখে বাবু নিজের প্রাণকে উৎসর্গ করে তাদের দুজনকে বাঁচাবার জন্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ছেলেটির বাবার মাথায় বিদ্যুতের মত খেলে গেল ,কুমিরে ধরেছে। দোষী ছেলের মত লাফ দিয়ে জলে পড়ল !কুমির জলের আওয়াজ শুনে সাথে সাথে বাবুকে টেনে নিয়ে চলে গেল জলের মধ্যে,, দুই ভাই মিলে ২, ৩ ঘণ্টা জলে ডুব মেরেও খোঁজাখুঁজি করলো, কিন্তু পেল না!
বড় ভাইয়ের আশঙ্কা হল, এবারে আমাদের দুজনের মধ্যে কাউকে না কাউকে আবার নেবে তাই সে ভায়ের হাত ধরে টেনে নৌকার উপরে তুলল। সে কিছুতেই আসতে চায় না নিজের সন্তানকে কুমিরের কাছে ছেড়ে রেখে।
প্রকৃতির কি নিদারুণ করুন ব্যবস্থা নিজেদের জীবন যাপনের জন্য মৃত্যুর সাথে লড়াই করে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার চেষ্টা যে করে তারা।
অনেক সময় সেই চেষ্টা করতে গিয়ে সেই জীবনটাকেই উৎসর্গ করে দিতে হয়।
যাইহোক ভাই জোর করে তাকে নৌকার উপরে তুলে দিয়ে ফুল স্পিডে মেশিন স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে আসলো।
বলাবাহুল্য সমুদ্রের উত্তল আর বৃষ্টির ও ঝড়ো হওয়ার দাপট ক্রমশ্য বাড়তে চলেছে।
লাইটের ইশারা দিয়ে দূরে ট্রলারকে এবং ফরেস্ট অফিসের বোটের আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে । ভাইয়ের আর্তনাদ।,
ভাইপের আত্ম বলি,
প্রকৃতির দানবীয় পরিস্থিতি, সবকিছু সামলে সে তার সমস্ত শক্তিগুলো একত্রিত করে নিয়ে বারবার সাহায্য চাওয়ার আশায় লাইটটা ঘুরাতে লাগলো পাগলের মত।
প্রায় আধঘন্টা পরে তারা বুঝতে পেরে প্রায় জনা দশেক লোক ট্রলার এবং ফরেস্ট অফিসার তারা সবাই আসলো।
সমস্ত বিষয়ে তারা শুনলো সাথে সাথে তাদেরকে নিয়ে সেই ঝরার মধ্যে গেল।
প্রত্যেকেই জানে
এখানে প্রায় বাঘ দেখা যায়।।
সুতরাং কুমিরতো রয়েছেই বোঝা যাচ্ছে কিন্তু বাঘ ও সেখানে আস্তানা বেঁধে থাকতে পারে সেটা তারা খেয়াল করতে পারছে।
খুবই সন্তর্পনে তারা তল্লাশি চালাতে লাগলো প্রায় চার ঘন্টা তল্লাশি করার পরে তারা লাশটাকে পেল।
ততক্ষণে একটা পা প্রায় খেয়ে নিয়েছে,,,
বড় ভাইয়ের কোন সন্তান ছিল না ছোট ভাইয়ের ওই একমাত্র সন্তান বাবু। সন্তান হারানোর শোকাতুর মন নিয়ে দুভাই বাড়ি ফিরল।
বাড়ির লোক ভেবেছিল বুঝি এবারে অনেকটা রোজগার করে তারা ফিরবে, আগামী কিছুদিনে তাদের সংসার টা অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে কাটবে। কিন্তু তারা কি আর জানত তারা তাদের তর তাজা সন্তানের মৃত লাশে টা নিয়ে আসবে যার শরীরটা ছিন্ন ভিন্ন অনেক অংশ কুমিরের পেটে।
হয়তো সুন্দরবন আপনি ঘুরেছেন ,অনেক মজা করেছেন, আনন্দ করেছেন।
কিন্তু এই সব ছোটখাটো সুন্দরবনে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনা।
আমাদেরকে শেখায় জীবন কতটা কঠিন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে কাটাতে হয়।
আপনার কি মনে হয় তারা কি আর জীবনে জঙ্গলে আসবে?
কিন্তু ক্ষুধার জ্বালা বড় জ্বালা, প্রায় একমাস পরে তারা দুভাই আবার,,, জঙ্গলে আসলো,, এবারে বড় ভাইকে বাঘে নিল!!
যখন আমি গল্পটা লিখছি এটা সেই ছেলেটির পিতা (গল্পের ছোট ভাই) তার মুখ থেকে শোনা।
সুন্দরবন এ বেড়াতে এসে তার নৌকা থেকে মাছ কিনলাম অনেক রকমের,, খুশি করে একটা বড় মাছ খেতেও দিল। আর সবচেয়ে বড় জিনিস এ গল্পটা শুনে মুগ্ধ হয়ে আজ লিখতে বসলাম।



